বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২২
Homeপ্রধান সংবাদটনক নড়েনি নৌকর্তৃপক্ষের, লঞ্চ চলছে আগের মতোই

টনক নড়েনি নৌকর্তৃপক্ষের, লঞ্চ চলছে আগের মতোই

বাংলাদেশ একটি দুর্যোগ কবলিত দেশ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি নিত্য নানা দুর্ঘটনার কবলে পড়তে হয় এই দেশটিকে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের চেয়ে মানবসৃষ্ট দুর্ঘটনাতেই যেন এ দেশ বেশি বিপর্যস্ত। প্রায় প্রতিনিয়ত অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটছে, ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা। তাজা, সজীব প্রাণ ঝরে যাচ্ছে চোখের পলকে। যেসব দুর্ঘটনার কথা কখনো কল্পনাও করা যায়নি, সেসব দুর্ঘটনাও এখন প্রায়শ ঘটতে দেখা যাচ্ছে। জলযানে আগুন ধরার মতো ঘটনাই এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। চারিদিকে জল, অথচ তারই মধ্যে বন্দি হয়ে মানুষ পুড়ে মারা যাচ্ছে আগুনে। এই ধরণের ভয়াবহ দুর্ঘটনার দায়ভার আসলে কার?
নদীর নাম, সুগন্ধা। কি মনোরম নাম। এমন মনোরম সুন্দর নামের নদীর বুকেই কিছুদিন আগে ঘটে গেলো ভয়ঙ্কর মৃত্যুর ঘটনা। দিনটি ছিল ডিসেম্বর মাসের ২৩ তারিখ। ওইদিন ঝালকাঠির সুগন্ধা নদী দিয়ে যাওয়ার সময় অভিযান-১০ লঞ্চে আগুন লাগে। ওই অভাবনীয় অগ্নিকান্ডের ঘটনায় অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর মৃত্যু হয় আরও অনেকের। এবং অনেকে নদীর ¯্রােতে ভেসে যায়। তাঁদের লাশ আজ পর্যন্ত তাঁদের স্বজনরা খুঁজে পায়নি।
ওই লঞ্চে থাকা যাত্রীরা অভিযোগ করেছেন, আগুন লাগার পরে তারা পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট বা বয়া পাননি। অনেককে সাঁতার না জানার পরেও পানিতে লাফিয়ে পড়তে হয়েছে। এমনকি আগুন নেভানোর পর্যাপ্ত সরঞ্জাম বা কর্মীদের প্রশিক্ষণও ছিল না।
বাংলাদেশের নৌপথে চলা অধিকাংশ লঞ্চের অবস্থাই মূলত এমন। এসব লঞ্চে যাত্রীদের সুরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত সুব্যবস্থা নেই। জানা যায়, সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ভয়াবগ অগ্নিদুর্ঘটনার পরও কর্তৃপক্ষের টনক নড়েনি। অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা ও যাত্রীর নিরাপত্তা সরঞ্জাম আগের মতোই। অনেক স্থানে বয়া থাকলেও বাতি জ¦লে না। ফলে ঢাকা-দক্ষিণাঞ্চল নৌপথে চলাচল করা লঞ্চগুলো দেখতে বিলাসবহুল হলেও বাস্তবে অনিরাপদ। এগুলোর বাইরে ফিটফাট, কিন্তু ভেতরে সদরঘাট।
সূত্র জানায়, নৌপথে নৌযানগুলোকে চলতে হয় অন্ধকার আস্তরণ ভেদ করে। ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলে আসার পথে মাঝেরচর খালের মুখে কোনো সিগন্যাল বাতি নেই। এ কারণে গত ৪ জানুয়ারি কার্গো হালিমা সোবাহান ডুবে গেছে। এই নৌপথে নিয়মিত যাতায়াতকারীরা জানায়, ঢাকা-বরিশাল রুটের হিজলা থেকে বাবুগঞ্জ খাঁড়ির মুখে বয়াবাতি দরকার, নলবুনিয়ায় বয়া আছে বাতি নেই। ঢাকা-আমতলী, পটুয়াখালী, গলাচিপা, খেপুপাড়া, রাঙ্গাবালী রুটের ভোলার ইলিশার জনতা বাজার এলাকায় বাতি নেই। সাদেকপুর পল্টনের কাছে বাতি নেই। ডান পাশের টেকে বাতি নেই। মাচকাজীপাড়ে বাতি নেই। ভেদরিয়ার শ্রীপুরের টেকে সিগন্যাল বাতি নেই। পাড়ে বাতি নেই। শ্রীপুরের চরে বাতি নেই। শ্রীপুর থেকে দুর্গাপাশা পর্যন্ত বয়া আছে, বাতি নেই।
সিগন্যাল বাতি নেই ঝালকাঠি-বরগুনা রুটেও। জানা যায়, ঝালকাঠি থেকে বরগুনা চ্যানেলে ঢোকার পথে চল্লিশ কাউনিয়ার বাঁ পাড়ের চরের মাথায় মার্কা, সিগন্যাল বাতি নেই। অদুয়ার ডান পাড়ের চরের মাথায় সিগন্যাল বাতি নেই। নিয়ামতি ঘাটের ডানে-বাঁয়ে মার্কা, সিগন্যাল বাতি নেই। নিয়ামতি থেকে বেতাগী পর্যন্ত কোনো মার্কা, সিগন্যাল বাতি নেই।
চালকরাও একই অভিযোগ করেছেন। তাঁরা জানান, ঢাকা থেকে ঝালকাঠির গাবখান চ্যানেলের পর বরগুনা পর্যন্ত ৩৯ কিলোমিটারে কোনো মার্কা ও সিগন্যাল বাতি নেই। এখানে রাতে ঝুঁকি নিয়ে লঞ্চ চালাতে হয়।
এতো গেলো বাতি বিভ্রান্তি। সমস্যা আছে লঞ্চের কর্মীদেরে মধ্যেও। এরা অধিকাংশই অদক্ষ। দুর্ঘটনার সময় কি পদিক্ষেপ নিতে হবে এ বিষয়ে তাদের কোন সম্যক জ্ঞান নেই। অভিযান-১০ অগ্নিকা-ের ঘটনায় সেখানকার কর্মীদের আগুন নেভাতে অদক্ষতা এবং প্রশিক্ষণের অভাবের বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। জানা যায়, সদরঘাট থেকে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে ২২১টি লঞ্চ চলাচলের অনুমতি রয়েছে। তার মধ্যে প্রতিদিন গড়ে ৮৫টি লঞ্চ ঢাকা থেকে ছাড়ে। একই সংখ্যক লঞ্চ বিভিন্ন রুট থেকে ঢাকার দিকে আসে।
দমকলের কর্মকর্তারা বলেছেন, এই লঞ্চে কয়েকটি অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র থাকলেও সেগুলোর কোন ব্যবহার হয়নি। এমনকি সদরঘাট থেকে চলাচলকারী লঞ্চগুলোয় কখনো অগ্নিনির্বাপণ মহড়াও হয় না। ফায়ার সার্ভিসের ঢাকার সদরঘাট স্টেশনের কর্মকর্তারাও নিশ্চিত করেছেন যে লঞ্চের কর্মীদের অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রের ব্যবহার সম্পর্কে কোন ধারণা নেই।
যাত্রীরা অভিযোগ করেছেন, বড় বড় দুর্ঘটনায় নিরাপত্তার অভাব নিয়ে আলোচনা হয়, কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন আসেনি। লঞ্চের মালিকরাও অবশ্য এখন বিপদ দেখে সুর পরিবর্তন করেছেন। কর্মীদের প্রশিক্ষণের অভাবের বিষয়টি তাঁরা অকপটে স্বীকার করছেন। কর্মীদের প্রশিক্ষণের ব্যাপারে তারা সরকারকে উদ্যোগ নেয়ার আহবান জানাচ্ছেন।
কিন্তু এসব উদ্যোগ, সতর্কতার কথা কেবল দুর্ঘটনা ঘটলেই শোনা যায়। দুর্ঘটনার কিছুদিন পরই এসব বিষয় ম্লান হয়ে যায়। অবস্থা ঠিক আগের মতোই চলতে থাকে। বাংলাদেশে নৌপথে দুর্ঘটনার ঘটনা এটিই যে নতুন তা কিন্তু নয়। ১৯৮৬ সালে অ্যাটলাস স্টার নামে একটি লঞ্চ ডুবে ২০০ জন যাত্রী মারা গিয়েছিলেন। লঞ্চটি ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন এবং খারাপ আবহাওয়ার কারণে ডুবে গিয়েছিল বলে সেসময় জানিয়েছিল বিআইডব্লিউটিএ। ২০০০ সালের ২৯শে ডিসেম্বর ঈদুল আজহার রাতে চাঁদপুরের মতলব উপজেলার ষাটনল এলাকায় মেঘনা নদীতে এমভি জলকপোত এবং এমভি রাজহংসী নামের দুটি যাত্রীবাহী লঞ্চের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে রাজহংসী লঞ্চটি পানিতে তলিয়ে যায়, সে সময় ওই লঞ্চের ১৬২ জন যাত্রী নিহত হয়েছিলেন। ২০০২ সালের ৩রা মে চাঁদপুরের ষাটনল সংলগ্ন মেঘনা নদীতে ডুবে যায় সালাহউদ্দিন-২ নামের একটি যাত্রীবাহী লঞ্চ। চাঁদপুরেই মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মোহনায় ২০০৩ সালের ৮ই জুলাই ঢাকা থেকে ভোলার লালমোহনগামী এমভি নাসরিন-১ নামের লঞ্চটি ডুবে যায়। ডুবে যাওয়ার সময় লঞ্চটিতে কত যাত্রী ছিলেন সে বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য রয়েছে। তবে ওই দুর্ঘটনায় সরকারি হিসাবে প্রায় সাড়ে ছয়শো মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। ২০১৪ সালের ৪ঠা অগাস্ট আড়াইশো’র বেশি যাত্রী নিয়ে পদ্মা নদীতে ডুবে যায় পিনাক-৬ নামের একটি লঞ্চ। বাংলাদেশের নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ বিআইডব্লিউটিএ জানিয়েছিল, ওই লঞ্চটি তোলা সম্ভব হয়নি, এবং এর ধ্বংসাবশেষও কখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি।
এছাড়া ২০০৫ সালে একটি ফেরী ডুবে গিয়ে ১১৮জন যাত্রী নিহত হন, এবং ২০০৫ সালে এমএল মিতালি ও এমএল মজলিশ নামে দুইটি ছোট লঞ্চের মুখোমুখি সংঘর্ষের পর ডুবে গিয়ে প্রায় ৩০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল।
বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। এদেশে অসংখ্য নদনদী থাকায় যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে বিভিন্ন ধরণের নৌযান। অন্য যোগাযোগ মাধ্যমের তুলনায় নিরাপদ এবং ব্যয়-সাশ্রয়ী হওয়ায় দেশের যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের একটি বড় অংশ এখনো নৌপথেই হয়ে থাকে। কাজেই নৌপথকে নিরাপদ করা ছাড়া কোন বিকল্প নেই। এজন্য বিশেষ কমিটি গঠনের প্রয়োজন আছে কিনা এ ব্যাপারেও ভেবে দেখার সময় এসেছে।

আরও খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

সাম্প্রতিক খবর

সর্বাধিক পঠিত

- Advertisment - spot_img