শুক্রবার, এপ্রিল ১২, ২০২৪
Homeপ্রধান সংবাদফাঁকা ঢাকায় চুরি-ডাকাতির ভয়, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

ফাঁকা ঢাকায় চুরি-ডাকাতির ভয়, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

চলতি মাসের ২৪ জুন রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যান এলাকার ৩ নম্বর সড়ক দিয়ে যাচ্ছিলেন মো. সেন্টু ওরফে শাকিল নামের এক যুবক। এ সময় একটি টেম্পোতে করে ১০ থেকে ১২ জন দুর্বৃত্ত তার গতিরোধ করে কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করে। স্থানীয়রা শাকিলকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় এখনো কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

পুলিশ বলছে, ঘটনাস্থলে কোনো সিসি ক্যামেরা না থাকায় এখনো হামলাকারীদের চিহ্নিত করা যায়নি। তবে ঘটনার বিবরণে যা জানা গেছে, শত্রুতার জেরেই হামলাকারীরা ওই যুবককে কুপিয়েছে।

গুলশানের ফাইভ স্টার নামে একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করেন সুমন্দ্র পাল (২৭)। গত ৩ ফেব্রুয়ারি রাত ১টার দিকে কাজ শেষে উত্তর বাড্ডার বাসায় যাওয়ার পথে ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন তিনি। ছিনতাইকারীর সঙ্গে ধস্তাধস্তির একপর‍্যায়ে তাকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। ঘটনার ১২ দিন পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সুমন্দ্র পাল।

গত ঈদুল ফিতরে গ্রামের বাড়িতে যান রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ইমামুল আরাফাত। ঈদের পর বাসায় ফিরে দেখেন জানালার গ্রিল কেটে ৩৭ ভরি স্বর্ণালংকার, দুটি ল্যাপটপ ও নগদ দুই লাখ টাকা নিয়ে গেছে চোর। চুরির ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেছেন ইমামুল আরাফাত।

রাজধানীতে প্রায় নিয়মিতই ঘটছে এমন ছিনতাই, চুরি ও ডাকাতির ঘটনা। নিরাপত্তার জন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) নানা তৎপরতা থাকলেও এখনো অনেক জায়গায় নেই সিসি ক্যামেরা। সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ভবন কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো স্থানে সিসি ক্যামেরা নেই। আবার কোথাও কোথাও সিসি ক্যামেরা থাকলেও তা বিকল।

গত কয়েকদিন রাজধানীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও স্থান ঘুরে দেখা গেছে, শিক্ষা ভবনের সামনের গেট ও সড়ক, খাদ্য ভবনের গেট ও সামনের সড়ক, টিএসসি, ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগের সামনের গেট ও সড়কে কোনো সিসি ক্যামেরা নেই। দেশের সাংস্কৃতিক চর্চার অন্যতম কেন্দ্র শিল্পকলা একাডেমির সামনের গেট ও সড়কে নেই কোনো সিসি ক্যামেরা। এমন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভবনের সামনে নেই সিসি ক্যামেরা।

হাতিরঝিলসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে নেই সিসি ক্যামেরা। মতিঝিল, খিলগাঁও, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, শাহ আলী, বাড্ডা, বিমানবন্দর থানা এলাকায় সিসি ক্যামেরা থাকলেও তা যৎসামান্য। এসব থানা এলাকার অধিকাংশ স্থানেই নেই কোনো সিসি ক্যামেরা। আবার কোনো কোনো জায়গায় সিসি ক্যামেরা থাকলেও তা বিকল। রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাশের মোড়েই দেখা যায় বিকল হয়ে আছে সিসি ক্যামেরা। সেগুনবাগিচায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে মৎস্য ভবনে যেতে শিল্পকলা একাডেমির পেছনের মোড়েও দেখা যায় একই চিত্র।

শুধু তাই নয়, রাজধানীতে সড়কেও সিসি ক্যামেরার উপস্থিতি খুবই কম। রাজধানীতে ট্রাফিকের আটটি বিভাগ রয়েছে। প্রতিটি বিভাগে মাত্র ১১টি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করেছে পুলিশ।

আর ডিএমপির তথ্য বলছে, ডিএমপির ৫০টি থানায় সিসি ক্যামেরা বসানো রয়েছে ৮৫৮টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সবুজবাগ, ডেমরা এবং শেরেবাংলা নগর থানার এলাকায় ৩২টি করে, পল্লবী থানায় ৩০টি ক্যামেরা আছে। আর সবচেয়ে কম ১০টি ক্যামেরা রয়েছে মতিঝিল থানা এলাকায়। এছাড়া খিলগাঁও, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, শাহ আলী, বাড্ডা, বিমানবন্দর থানার এলাকায় সিসি ক্যামেরা রয়েছে ১১টি করে। ট্রাফিক বিভাগের আটটি অঞ্চলে ৬৪টি সিসি ক্যামেরা রয়েছে।

এর মধ্যেই গত বছর ডিএমপিতে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে ১৬৫টি, চুরির ঘটনা এক হাজার ৬০৩টি। ২০২১ সালে ঘটেছিল এক হাজার ৩৪৩টি। ২০২০ সালে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছিল ১৭৬টি, চুরির ঘটনা এক হাজার ২১৭টি। আর চলতি বছররে এপ্রিল পর্যন্ত ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা হয়েছে ৪৪টি এবং চুরির ঘটনা ঘটেছে ৪৮৬টি। একই ধারাবাহিকতা দেখা গেছে চলতি মাসও।

চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ছিনতাইয়ের ঘটনার অধিকাংশই ঘটে যেসব স্থানে সিসি ক্যামেরা নেই বা নির্জন। ফলে ছিনতাইকারীদের চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে যায়।
রাজধানীবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে নানা পদক্ষেপ নিয়ে থাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অপরাধীকে চিহ্নিত করা ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভবন, প্রতিষ্ঠান, সড়ক বা স্থানে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার জন্য সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়। তবে কোনো কোনো জায়গায় সিসি ক্যামেরা যেমন নেই, তেমনি কোথাও কোথাও যা আছে তাও বিকল।

এমন পরিস্থিতিতে ঈদে ফাঁকা ঢাকায় নগরীর নিরাপত্তা কতটুকু নিশ্চিত করা যাবে জানতে চাইলে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) ড. খ. মহিদ উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, দুই কোটি মানুষ রাজধানীতে বসবাস করে। তারপরও আমরা চেষ্টা করি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সবকিছু সিসি ক্যামেরার আওতায় নিয়ে আসার। কিন্তু আমরা সবাইকে বলি নিজ নিজ উদ্যোগে যেন সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়। আর সিসি ক্যামেরা একটি ইলেকট্রনিক ডিভাইস। তাই এটা নানা কারণে নষ্ট হয়। যেসব ক্যামেরা নষ্ট হয়ে যায় সেগুলো আমরা পরিবর্তন করি। আর ব্যক্তি উদ্যোগে যারা সিসি ক্যামেরা লাগিয়েছেন নষ্ট হয়ে গেলে সেগুলোর বেশিরভাগ ঠিক করা হচ্ছে না। যদিও আমাদের পক্ষ থেকে ঠিক করতে বলা হয় থাকে।

অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বলেন, আমাদের পুলিশ সদস্যরা ঈদের মধ্যেও নগরবাসীর নিরাপত্তায় কাজ করছেন। পুলিশের টহল থাকছে বিভিন্ন সড়কে। কূটনৈতিক এলাকার নিরাপত্তায় আমাদের বিশেষ নজরদারি রয়েছে।

র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, নগরীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়। সিসি ক্যামেরার ক্ষেত্রে আমরা জনপ্রতিনিধিসহ এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বলেছি যেন সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়। কোনো অপরাধ হলেও যেন অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা যায়। এছাড়া আমাদের পুলিশের ক্রাইম বিভাগের প্যাট্রোল টিমসহ বিভিন্ন টিম কাজ করছে। যাতে অপরাধীরা অপরাধ না করতে পারে।

আর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনবহুল এ নগরীতে অপরাধীরা এখানে সহজেই নিজেকে আড়াল করতে পারে। ঈদ কিংবা কোনো উৎসবে অপরাধের মাত্রা বেড়ে যায়। নিরাপত্তার জন্য ক্যামেরা স্থাপন করলেই হবে না, সেগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণও প্রয়োজন। তা না হলে এটি কেবল অর্থের অপচয়।

এ নিয়ে অপরাধ বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, জনবহুল এ নগরীতে নানা ধরনের মানুষের বসবাস। অপরাধীরা এখানে সহজেই নিজেকে আড়াল করতে পারে। ঈদ কিংবা কোনো উৎসবে অপরাধের মাত্রা বেড়ে যায়। অপরাধ নিয়ন্ত্রণ বা নগরবাসীর নিরাপত্তার জন্য বাসা থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ সব প্রতিষ্ঠান ও স্থানে সিসি ক্যামেরা লাগানো দরকার। তবে ক্যামেরা শুধু লাগালেই হবে না, সেটা দেখভালও করতে হবে। আমাদের দেশে যারা কাজ করার কথা তারা কাজ করেন না, জবাবদিহি নেই। আবার বাজেটের স্বল্পতা, সম্পদের স্বল্পতা তো রয়েছে। পরিকল্পিতভাবেও আমরা কোনো নীতি গ্রহণ করি না, পরিচালনা করি না। তদারকি না করে নামমাত্র সিসি ক্যামেরা লাগিয়ে রাখলে সেটা কোনো কাজেই আসবে না।

তিনি বলেন, কোনো বিষয়ে পরিকল্পনা ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন না হলে শুধু অর্থের অপচয় হয়। যেসব জায়গায় ছিনতাই হয়, সেখানে পর‍্যাপ্ত লাইটের ব্যবস্থা, পুলিশের টহল ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

রাজধানীর নিরাপত্তা জোরদারে ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনারদের (ডিসি) কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গত ২২ জুন ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (অপারেশনস) বিপ্লব কুমার সরকার সই করা এক বার্তায় ডিসিদের এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। ১৭ দফার ওই নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে- ঈদের সময় ব্যাংক, সোনার দোকান, মার্কেটের নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে, আশপাশের দোকান দিয়ে ঢুকে যেন চুরি, ডাকাতি করতে না পারে সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। দায়িত্বরত নিরাপত্তাপ্রহরীদের সঙ্গে পুলিশের সমন্বয়ের কথাও বলা হয়েছে নির্দেশনায়। এছাড়া বাসাবাড়ির নিরাপত্তায় বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট জোরদারের কথাও বলা হয়েছে নির্দেশনায়।

আরও খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

সাম্প্রতিক খবর

সর্বাধিক পঠিত

- Advertisment - spot_img