সোমবার, অক্টোবর ৩, ২০২২
Homeপ্রধান সংবাদবাংলাদেশের সামনে অপেক্ষা করছে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের সামনে অপেক্ষা করছে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ

এক্সক্লুসিভ: ‘কূটনীতি’ হচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিদ্যার একটি শাখা যেখানে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠান গুলোর মধ্যে পারস্পরিক চুক্তি বা আলোচনা সর্ম্পকিত কলা কৌশল অধ্যয়ন করা হয়। সাধারণ অর্থে কূটনীতি হচ্ছে কোন রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পরিচালিত সরকারি কার্যক্রম।
হাঁটি হাঁটি পা পা করে স্বাধীন বাংলাদেশ আজ কূটনীতির ৫০ বছর অতিক্রম করেছে। এই ৫০ বছরে বাংলাদেশের অর্জন কম নয়। ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়’Ñকূটনীতিতে বঙ্গবন্ধুর এ মূলমন্ত্র বাংলাদেশ অনুসরণ করে চলেছে এবং তা গত ৫০ বছর এ দেশের কূটনীতিতে সময়োচিত হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। তবে সামনে চ্যালেঞ্জও আছে অনেক। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়েই বাংলাদেশের কূটনীতি শুরু হয়। ওই বছরের শেষের দিকে ভুটান ও ভারত স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। তবে বিশ্বের বেশির ভাগ রাষ্ট্র বাংলাদেশকে ১৯৭২ সালে স্বীকৃতি দেয়।
এটি সত্য যে, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের পক্ষে প্রত্যাশিত সহযোগিতা মেলেনি চীনের কাছ থেকে। তবে সময়ের পরিক্রমায় বাংলাদেশের অন্যতম বন্ধুপ্রতিম দেশ এখন চীন। এর অর্থ হচ্ছে, দেশের স্বার্থে কূটনৈতিক পাড়ায় কোনো রাষ্ট্র চিরকালীন বন্ধু বা শত্রু নয়। এ-যাবৎকালে বাংলাদেশের বড় উন্নয়ন সহযোগীদের তালিকায়ও জায়গা করে নিয়েছে চীন।
নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে ২০২১ সাল বিদায় নিলো। ২০২২ সালে অনেক দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনীতির ৫০ বছর উদযাপিত হবে। এসব দিক বিবেচনায় ৫০ বছরের কূটনীতি নিয়ে বিভিন্ন মহলে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা, বাণিজ্য, বিনিয়োগসহ বহুমুখী কূটনীতির প্রসার এবং বিদেশে বড় শ্রমবাজার প্রতিষ্ঠা বড় অর্জন হলেও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করে বাংলাদেশের উন্নতির ধারা অব্যাহত রাখাই হবে আগামী দিনে কূটনীতির বড় চ্যালেঞ্জ।
এটি স্পষ্ট যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞা, মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে চলমান সমালোচনা এবং ২০২৩ সালে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন মাথায় রেখে নতুন বছরে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর বিশেষ দৃষ্টি থাকবে বাংলাদেশের ওপর। অর্থনৈতিক অগ্রগতি, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণসহ বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশ কূটনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব পাবে। এ অবস্থায় দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি প্রভাবশালী দেশের আতশি কাচের নিচে থাকবে বছরজুড়ে।
অতিসম্প্রতি র‌্যাব কর্মকর্তাদের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে বাংলাদেশ ভাবমূর্তি সংকটে পড়েছে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে বাংলাদেশ সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের দায়ে এলিট ফোর্সটির সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বাইডেন প্রশাসন।
যুক্তরাষ্ট্রের এই নিষেধাজ্ঞার পর চীন বাংলাদেশকে আরো কাছে টানার চেষ্টা করবেÑএমনটা আশা করা যায়। তবে এটি বাংলাদেশের জন্য পরীক্ষা হবে। কারণ বেইজিং, ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রাখাটা সহজ হবে না।
এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য একটি খারাপ সংবাদ। এর একটি নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়বে, কেননা যুক্তরাষ্ট্র হলো বিশ্ব অর্থনীতির মোড়ল। নিষেধাজ্ঞা আরোপের এক সপ্তাহের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেনের বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেনকে ফোন করেন। এই ব্যাপারটিকে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা। তাঁদের মতে, র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিলেও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে সচল সম্পর্ক রাখতে চায়। বাংলাদেশ যদি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ নিরসনে উদ্যোগ না নেয় তবে আগামী দিনে আরো নিষেধাজ্ঞার সম্ভাবনা কেউ উড়িয়ে দিতে পারবে না।’
এ বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবিরের ভাষ্য, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বহুমাত্রিক। ফলে অন্য কোনো ক্ষেত্রে যাতে তার প্রভাব না পড়ে তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগসমূহ গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।’
বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়েও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ লক্ষ্যনীয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো সমালোচনা করেছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন নিয়ে সমালোচনা করলেও বাংলাদেশের কূটনৈতিক কাঠামোর ভূমিকায় সেই নির্বাচন আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। তবে সুশাসন, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যের প্রতিবেদনে ওই নির্বাচনে নানা অনিয়মের প্রসঙ্গ এসেছে। সর্বশেষ গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আয়োজিত বৈশ্বিক গণতন্ত্র সম্মেলনে বাংলাদেশ আমন্ত্রণ পায়নি।
এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বাংলাদেশ ভূরাজনৈতিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ। এই ভূ-রাজনীতির গোলকধাঁধার কারণে সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের কূটনীতি কঠিন এক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এশিয়ায় চীনের প্রভাব বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তা মোকাবিলায় মরিয়া। যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্র হিসাবে ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তুলেছে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি। অন্যদিকে চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ নিয়ে এগিয়ে যেতে চায়। ফলে দুই শক্তির সঙ্গে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের সামনে রয়েছে। বাংলাদেশ নিজ দেশের অগ্রগতির প্রতি জোর দিয়ে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়’ নীতি নিয়ে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করে থাকে। এই নীতির কারণে কোনো বিশেষ পক্ষের প্রতি ঝুঁকে থাকা বাংলাদেশের প্রবণতা নয়। রোহিঙ্গা সংকট নানা কারণে সমাধান হচ্ছে না। এ নিয়ে বাংলাদেশের কূটনীতি সক্রিয় থাকলেও কার্যকর কোনো ফল পাওয়া যাচ্ছে না। রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান বাংলাদেশের কূটনীতির সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অকৃত্রিম বন্ধু হলো ভারত। স্বাধীনতার পর থেকেই দেশটির সাথে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক বিদ্যমান। তখন থেকে আজ পর্যন্ত দুই প্রতিবেশীর মধ্যে অনেক বড় বড় সমস্যার সমাধান হয়েছে। বিশেষ করে ছিটমহল বিনিময়সহ সীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন এবং সমুদ্রসীমা চিহ্নিতকরণ অন্যতম। তবে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি সই এখনো সম্ভব হয়নি। সীমান্ত হত্যা বন্ধের প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়ন হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিম দেশগুলো বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার। অন্যদিকে চীন, জাপানসহ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ক্রমেই জোরালো হলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচালে দুলছে।
তবে ধারণা করা হচ্ছে, পশ্চিমাদের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক আলোচনায় মানবাধিকার ইস্যু প্রাধান্য পাবে নতুন বছরে। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে মানবাধিকার ইস্যুতে বাংলাদেশের কাছ থেকে আরো আশ্বাস আদায়ের ক্ষেত্র পাবে।

আরও খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

সাম্প্রতিক খবর

সর্বাধিক পঠিত

- Advertisment - spot_img