বুধবার, জুলাই ২৪, ২০২৪
Homeআমেরিকামিনহাজের ছবি ও কথা

মিনহাজের ছবি ও কথা

মিনহাজ আহমেদ, নিউইয়র্ক।
বাংলাদেশ স্ট্রিট ও কাঠি লজেন্স
নিউ ইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের এক সদস্য, টগবগে তরুণ শেখর কৃষ্ণানের ‘লিটল’ শব্দটা পছন্দ নয়। তিনি বললেন, ‘লিটল বাংলাদেশ’ হবে কেনো, এটাকে হতে হবে ‘বাংলাদেশ স্ট্রিট’। তা-ই হয়েছে। জ্যাকসন হাইটস্-এর থার্টি সেভেন্থ অ্যাভিনিউ থেকে থার্টি সেভেন্থ রোড পর্যন্ত সেভেনটি থার্ড স্ট্রিট এখন থেকে বাংলাদেশ স্ট্রিট। হবেনা কেনো, এই স্থানটিতে বাংলাদেশ হলো সিংহভাগ, আর ভারত, পাকিস্তান এবং অন্য দেশি সবাই মিলে হবে ইঁদুরভাগ!
গতকাল ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসে উন্মোচিত হলো ‘বাংলাদেশ স্ট্রিট’ নামফলক। নামফলক উন্মোচন করলেন শেখর কৃষ্ণান, যার জোরালো সমর্থনে বাংলাদেশি কমিউনিটির দীর্ঘদিনের এই দাবিটি পূরণ হলো।

শেখর কৃষ্ণান উত্তরভারতীয় বংশোদ্ভুত আমেরিকান। বক্তৃতায় স্বল্প কথায় বুঝিয়ে দিলেন- তিনি বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানের ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন। তাই তার বক্তৃতায় ঝরেছিলো আবেগ। আমেরিকান পুঁজিবাদী রাজনীতির চাতুর্যময় বাগ্মীতাও ছিলো তাতে। বলাবাহুল্য, বাংলাদেশিরা নিজের দেশের নামে একখানা স্ট্রিট পেয়ে আহ্লাদে উদ্বেলিত হয়ে উঠেছিল। নিউ ইয়র্কে ঝলসে উঠেছিল একটুকরো দূরবর্তী বাংলাদেশ।

বড় বিচিত্র পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাস। সাতচল্লিশের আগে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান এক ছিলো, একযোগে লড়েছে বৃটিশ তাড়াতে। পয়ষট্টিতে ভারত পাকিস্তান লড়েছে পরস্পরের সাথে। সে লড়াইয়ে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান তথা বাংলাদেশ ভারতকে পরাজিত করতে প্রচণ্ড সাহসী ভূমিকা রেখেছে। আবার সেই ভারতই একাত্তর বাংলাদেশি শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছে, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও গোলাবারুদ দিয়ে সহায়তা করেছে, কুটনৈতিক ক্ষেত্রে জোরালো সমর্থন দিয়েছে, এবং যুদ্ধে সরাসরি যুক্ত হয়ে বাংলাদেশকে হানাদান পাকিস্তানিদের হাত থেকে উদ্ধার করতে রক্তও দিয়েছে।

এবার ভাবা যাক তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কথা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাষ্ট্রীয়ভাবে শুধু আমাদের বিরুদ্ধে কুটনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেই ক্ষান্ত থাকেনি, তারা অস্ত্র দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনিকে সমর্থন দিয়েছে। পাকিস্তানে অস্ত্র পাঠানোয় নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে জাহাজ বোঝাই করে বিশাল অস্ত্রসম্ভার পাঠাবার সকল প্রস্তুতিও সম্পন্ন করেছিল। এভাবে তারা পৃথিবীর ইতিহাসের এক জঘন্যতম জেনোসাইড সংঘটিত করতে মদদ দিয়েছে। শুধু কি তাই, চুয়াত্তরে এই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই আবার খাদ্য পরিবর্হনকারী জাহাজকে বঙ্গোপসাগর থেকে ফিরিয়ে এনে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করতে সহায়তা করেছে। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র সরকার পচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর বঙ্গবন্ধুর খুনিদের আশ্রয় দিয়ে, অতি সাম্প্রতিককাল পর্যন্ত বার বার ষড়যন্ত্রমূলকভাবে অভ্যন্তরীন রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করে বাংলাদেশে নতজানু সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। তবে আমেরিকার সাধারণ জনগণ, এক শ্রেণির রাজনীতিবিদ, শিল্পী, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরা সব সময়ই গণপ্রজাতান্ত্রিক স্বাধীন বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়েছেন, যেমন তারা সমর্থন দিয়েছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা আন্দোলনে। একই কারণে বর্তমান বাংলাদেশ তার অভ্যন্তরীন রাজনীতি নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে।

গতকাল যখন ‘বাংলাদেশ স্ট্রিট’ নামফলক উন্মোচন করার পর শেখর কৃষ্ণনকে মাথায় নিয়ে জাতীয়তাবাদী বাংলাদেশি এবং আওয়ামী বাংলাদেশিদের মিলিতভাবে উল্লাস করছিলেন দেখে বিষয়টিকে আমার কাছে বেশ আনন্দজনক ও মঙ্গলজনক বলে মনে হলো। প্রবাসে বাংলাদেশি কমিউনিটিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চেতনাবোধ নিয়ে ঐক্যের যেমন আকাল দেখা যায়, ঠিক স্বদেশেও তেমনটা দেখা যায়। একথা সত্য যে, বাংলাদেশের উন্নতিতে এই রাষ্ট্রীয় বিভেদ বা ঐক্যের অভাব আমাদের দেশের উন্নতি ও অগ্রগতিতে প্রচণ্ড রকমের বিরূপ প্রভাব ফেলছে। ভালো লাগার আরেকটি বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত শেখর কৃষ্ণানকে সম্প্রসারণবাদী ও হিন্দুত্ববাদী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর চর, এবং শেখর কৃষ্ণানকে মাথায় তোলে উল্লাসকারীদেরকে আওয়ামী লীগের চর বলে আখ্যায়িত করেননি।

আমি স্বীকার করছি যে, আমার ভাবনা মাঝে মাঝে দ্বিধাবিভক্ত হয়। গতকাল বাংলাদেশের নামে আমরা ছোট্ট একখণ্ড সড়ক পেয়ে যে মাত্রায় উল্লাস করছি, সেটা নিয়ে আমার ভাবনাও বার বার দ্বিখণ্ডিত হয়েছে। কমিউনিটির অনেকের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে উল্লসিত হওয়ার পাশাপাশি আমার মাঝে ক্ষোভেরও সঞ্চার হচ্ছিল। আমার মনে হচ্ছিল, আমরা বাংলাদেশিরা বড্ড বোকা, আমাদেরকে যে কেউ আহাম্মক সাজিয়ে গরু কিংবা অন্য কিছু মেরে হাতে কাঠি লজেন্স বা অন্য কিছু ধরিয়ে দিয়ে মহৎ সাজতে পারে। তা না হলে যাদের মদদে আমাদের দেশে সংঘটিত হয়েছিল ইতিহাসের এক জঘন্যতম নিষ্ঠুর নরহত্যাযজ্ঞ, যাতে তিরিশ লক্ষ বাঙালিকে শহীদ, আর দুই লক্ষ মা-বোনকে ধর্ষিতা হতে হয়েছে, কী করে ভুলে যাই আমরা সে ইতিহাস? রাস্তার কোনায় একটি ল্যাম্প-পোস্ট-এ ‘বাংলাদেশ স্ট্রিট’ লিখা একটি ফলক দেখে পুলকে পুলকে বিগলিত হয়ে ধুলায় মিশে যাই, ভুলে যাই এ কথা যে, এ দেশের সরকার আমাদের সাজাপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীর এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীর নির্ভয় আশ্রয়দাতা। আমরা ভুলে যাই একাত্তরের এই আচরণের জন্য এই দেশ কখনও ভুল স্বীকার করাতো দূরের কথা, রাষ্ট্রীয়ভাবে দুঃখপ্রকাশও করেনি।

পরিশেষে বলতে চাই, সকল জল্পনা-কল্পনা এবং বিচার বিশ্লেষণ সত্ত্বেও এটা সত্যি যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে বিরোধীতাকারী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ‘বাংলাদেশ স্ট্রিট’ নামের ছোট্ট এক সড়কখণ্ড প্রমাণ দিচ্ছে যে, একাত্তরের ২৬ শে মার্চ জন্ম হয়েছিল যে রাষ্ট্রের, সে রাষ্ট্রটি আজ পৃথিবীর বুকে এক জ্বলন্ত সত্য। গণহত্যা, ধর্ষণ, সপ্তম নৌবহরের হুমকি, কোনো কিছুই বাংলাদেশের জন্মকে রুখতে পারেনি। বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, দুই দেশসহ বিশ্বের শান্তিকামী সাধারণ মানুষ এসব বিষয়ে অভিন্ন মত পোষণ করেন বলেই এটা সম্ভব হয়েছে।

আরও খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

সাম্প্রতিক খবর

সর্বাধিক পঠিত

- Advertisment - spot_img