শুক্রবার, এপ্রিল ১২, ২০২৪
Homeপ্রধান সংবাদশুরু হলো শারদোৎসব

শুরু হলো শারদোৎসব

ঢাকা, ২০ অক্টোবর, ২০২৩: ঢাকে পড়েছে কাঠি। আলো-সানাই-শঙ্খ আর কাঁসার রোয়াবে হিন্দু নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরদের প্রাণ আনচান করছে। মৃন্ময়ী থেকে আনন্দময়ীর রূপদান পর্বের সমাপ্তি। হিন্দুদের বিশ্বাসে কৈলাসশিখর ছেড়ে পিতৃগৃহে আসা দুর্গার অকালবোধন হয়েছে গতকাল। আকাশে-বাতাসে এখন শারদ উৎসবের বিন্দাস শিহরণ। শিল্পী তার তুলির নিপুণ আঁচড়ে বর্ণাঢ্য বিভায় উদ্ভাসিত করে তুলেছে মহিষাসুর মর্দিনীকে। প্রতিমার অধিষ্ঠান হয়েছে মণ্ডপে। আজ খুলে যাবে তার আয়ত চোখের পলক। অসুরবধে চক্র, গদা, তির, ধনুক, খড়্গ-কৃপাণ-ত্রিশূল হাতে মাতৃরূপেন অসুরদলনী দেবী হেসে উঠবেন। ধূপের ধোঁয়ায় আজ সায়ংকালে ঢাক-ঢোলক-কাঁসর-মন্দিরার চারদিক কাঁপানো নিনাদ আর পুরোহিতদের জলদকণ্ঠে :‘যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেন সংস্থিতা, নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নম নম’ মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যে দূর কৈলাস ছেড়ে মা পিতৃগৃহে আসবেন ঘোটকে। ফল ‘ছত্রভঙ্গস্তুরঙ্গমে’। অর্থাৎ, ঘোটকে আগমনে প্রাকৃতিক বিপর্যয়, রোগ-শোক, হানাহানি-মারামারি, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংসারিক ক্ষেত্রে অস্থিরতা প্রকাশ পাবে। বিজয়া দশমীতে এয়োস্ত্রীদের দেবীবরণ ও সিঁদুর খেলার পর বিদায় নেবেন ঘোটকেই।

বিশুদ্ধ হিন্দু সিদ্ধান্ত পঞ্জিকামতে আজ পূর্বাহ্নে ৯-৫৭ মধ্যে ষষ্ঠাদি কল্পারম্ভ, সায়ংকালে দেবীর আমন্ত্রণ ও অধিবাস। গতকাল সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিট ৩৫ সেকেন্ডের পর ষষ্ঠী তিথির সূচনা ঘটে। আজ রাত ৮টা ২৩ মিনিট ৪৫ সেকেন্ড অব্দি তিথি থাকবে। অতঃপর শুরু হবে মহাসপ্তমী তিথি। আগামীকাল মহাসপ্তমীর প্রভাতে ঢাক-ঢোলক-কাঁসর বাজিয়ে কলাবউ স্নান ও আদরিণী উমার সপরিবারে তিথি বিহিত পূজা। রবিবার মহাষ্টমীতে ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশনে অনুষ্ঠিত হবে কুমারী পূজা। সোমবার সকাল ৬টা ৩০ মিনিটে শুরু হবে নবমী বিহীত পূজা। পরদিন মঙ্গলবার সকাল ৭টায় পূজা সমাপণ ও পরে দর্পণ বিসর্জন-শান্তিজল গ্রহণ। সাধারণত আশ্বিন শুক্লপক্ষের ষষ্ঠ দিন, অর্থাত্ ষষ্ঠী থেকে দশম দিন, অর্থাত্ দশমী অবধি পাঁচ দিন দুর্গোত্সব অনুষ্ঠিত হয়। এই পাঁচটি দিন যথাক্রমে দুর্গাষষ্ঠী, মহাসপ্তমী, মহাষ্টমী, মহানবমী ও বিজয়া দশমী নামে পরিচিত। আবার সমগ্র পক্ষটি দেবীপক্ষ। দেবীপক্ষের সূচনা হয় পূর্ববর্তী অমাবস্যার দিন; এই দিনটি মহালয়া। অন্যদিকে দেবীপক্ষের সমাপ্তি পঞ্চদশ দিন পূর্ণিমায়; এই দিন কোজাগরী পূর্ণিমা নামে পরিচিত এবং সাম্বত্সরিক লক্ষ্মীপূজার দিন।

দুর্গাপূজা মূলত পাঁচ দিনের অনুষ্ঠান হলেও মহালয়া থেকেই প্রকৃত উত্সবের সূচনা ও কোজাগরী লক্ষ্মীপূজায় তার সমাপ্তি। কোনো কোনো পরিবারে অবশ্য পনেরো দিনে দুর্গোৎসব পালনের প্রথা আছে। রাজধানীতে মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির নেতৃত্বে দশমীর দিন বিকেলে পলাশীর মোড় থেকে প্রতি বছরের মতো বিজয়া শোভাযাত্রা ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির হয়ে পলাশী বাজার, জগন্নাথ হল, কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার, দোয়েল চত্বর, হাইকোর্ট, বঙ্গবাজার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ভবন, গোলাপ শাহ্ মাজার, গুলিস্তান মোড়, নবাবপুর রোড, রায় সাহেব বাজার, বাহাদুর শাহ পার্ক হয়ে বুড়িগঙ্গা নদীর ওয়াইজঘাটে বিভিন্ন পূজামণ্ডপের প্রতিমা নিরঞ্জনের মাধ্যমে শেষ হবে। বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ জানিয়েছে, এবার সারা দেশে ৩২ হাজার ৪০৮টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। আর রাজধানী ঢাকায় এবার পূজা অনুষ্ঠিত হবে ২৪৬টি মণ্ডপে। গত বছর সারা দেশে ৩২ হাজার ১৬৮টি মন্দিরে এবং রাজধানীতে ২৪১টি মন্দিরে পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মণ্ডপে পূজার পাশাপাশি ভক্তিমূলক সংগীতানুষ্ঠান, বস্ত্র বিতরণ, মহাপ্রসাদ বিতরণ, আরতি প্রতিযোগিতা, স্বেচ্ছা রক্তদান ও বিজয়া শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া ঢাকায় রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠ পূজামণ্ডপ, গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা পরিষদ মণ্ডপ, রমনা কালীমন্দির ও আনন্দময়ী আশ্রম, বরোদেশ্বরী কালীমাতা মন্দির ও শ্মশান, সিদ্ধেশ্বরী কালীমাতা, ভোলানাথ মন্দির আশ্রম, জগন্নাথ হল, ঋষিপাড়া গৌতম মন্দির, শাঁখারীবাজারের পানিটোলা মন্দিরসহ অন্যান্য মণ্ডপে দুর্গোৎসবের ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

মাইক ও আতশবাজি-পটকা ব্যবহার না করার আহ্বান
এদিকে মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির পক্ষ থেকে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে সার্বিকভাবে মায়ের অর্চনাসহ বিভিন্ন নির্দেশনা প্রদান করা হয়। নির্দেশনায় বলা হয়, প্রতিমা তৈরি থেকে পূজা সমাপ্তি পর্যন্ত প্রতিটি পূজামণ্ডপে নিজ উদ্যোগে নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে সংশ্লিষ্ট মণ্ডপ কর্তৃপক্ষ প্রশাসনের আইনশৃঙ্খলা সদস্যদের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। পূজা মন্দিরে নারী ও পুরুষের পৃথক যাতায়াতের ব্যবস্থা রাখতে হবে এবং শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য নিজস্ব নারী-পুরুষ স্বেচ্ছাসেবক রাখতে হবে। স্বেচ্ছাসেবকদের নামের তালিকা (মোবাইল নম্বরসহ) জেলা ও কেন্দ্রে পাঠাতে হবে। সন্দেহভাজন দর্শনার্থীদের দেহ তল্লাশির ব্যবস্থা এবং নারী স্বেচ্ছাসেবকের মাধ্যমে নারী দর্শনার্থীদের দেহ তল্লাশির ব্যবস্থা রাখতে হবে। উচ্চ শব্দের কারণে বিরক্তি উদ্রেককারী মাইক-পিএসেট ও আতশবাজি-পটকার ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। ভক্তিমূলক সংগীত ছাড়া অন্য কোনো গান বাজানো থেকে বিরত থাকতে হবে। কারো ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগে এরূপ কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার কথাও নির্দেশনায় বলা হয়।

থিমভিত্তিক প্রতিমার প্রবণতা
এদিকে ভারতের কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গের মতে বাংলাদেশেও থিম বা নির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক মণ্ডপ ও প্রতিমা নির্মাণের প্রবণতা বেড়েছে। নিত্যনতুন থিম ও প্রতিমায় অভিনবত্বের পাশাপাশি থাকছে ঐতিহ্যের ভিন্নতা। কোনো কোনো মণ্ডপে প্রাচীন রোমান দেব-দেবী ধাঁচের প্রতিমা বানানো হয়েছে। পদ্ম ফুলের ওপর প্রতিমা, গহিন অরণ্যে দুর্গা, মহাপ্রলয়ের মাঝখানে বরফের পাহাড়ে শ্বেতশুভ্র বসনে, বৃক্ষের মধ্যে এমনকি দুর্গাকে মহাকাশে তার দেহভঙ্গিমায় সুললিত ভাবের বদলে রোবোটিক চেহারায় থিম গড়া হয়েছে। তবে এগুলোর নির্মাণ নির্ভর করেছে আর্থিক সংগতির ওপর। যে মণ্ডপ কমিটির যত অর্থের সংস্থান, তারা তত জৌলুস এনেছে প্রতিমায়।

আরও খবর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -spot_img

সাম্প্রতিক খবর

সর্বাধিক পঠিত

- Advertisment - spot_img